কুমিল্লা নগরে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দাপট: তীব্র যানজটে নাভিশ্বাস নগরবাসীর
কুমিল্লা নগরে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দাপট: তীব্র যানজটে নাভিশ্বাস নগরবাসীর
কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় থেকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। স্বাভাবিক গতিতে যেকোনো মোটরযানে এই পথটুকু পাড়ি দিতে ১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। অথচ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে এই সংক্ষিপ্ত দূরত্ব অতিক্রম করতেই এখন সময় লাগছে পৌনে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। কেবল প্রধান সড়কগুলোই নয়, শহরের অলিগলির অবস্থাও এখন যানজটে পুরোপুরি অচল।
সকাল ৯টা থেকে শুরু করে রাত ১১টা পর্যন্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অবরুদ্ধ অবস্থা বজায় থাকে। স্থানীয়দের মতে, ব্যাটারিচালিত মিশুক ও ইজিবাইকের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া এবং নিয়মকানুন না মেনে যত্রতত্র চলাচলাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
যাত্রী ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ভাড়া
যানজটের কারণে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। শহরের ঠাকুরপাড়া এলাকার এক অভিভাবক জানান, সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে যেখানে ৫ থেকে ১০ মিনিট লাগার কথা, সেখানে এখন আধা ঘণ্টাতেও পৌঁছানো যাচ্ছে না। সময় অপচয়ের পাশাপাশি ভাড়াও দিতে হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি—২০ টাকার নির্ধারিত পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় গুনতে হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। রাস্তায় যানবাহনের ধারণক্ষমতার চেয়ে অটোরিকশার সংখ্যা বহুগুণ বেশি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন
কুমিল্লা জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমানে নগরীতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার মিশুক ও ইজিবাইক চলাচল করছে। বিপুলসংখ্যক এই অবৈধ যানবাহনের কারণে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত গতি ও বিশৃঙ্খল চলাচলের ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ২০২৩ সালের মে মাসে সার্কিট হাউসের সামনে একটি বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হন স্থানীয় এক সাংবাদিক। চিকিৎসাসেবা পাওয়ার দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি আজও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। নগরবাসীর একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এসব যানবাহন এখন চলাচলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ
কুমিল্লা নগরের এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। কুমিল্লার সিটি প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা জানান, অনুমোদন দেওয়ার সার্বিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মোট সাত হাজার যানবাহনকে বৈধতা দেওয়া হবে, যার মধ্যে রয়েছে পাঁচ হাজার মিশুক এবং দুই হাজার ইজিবাইক। এসব নিবন্ধিত যানবাহনের চালকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক ও বিশেষ পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হবে। আর অনুমোদনহীন কোনো অটোরিকশাকে শহরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
গ্যারেজভিত্তিক ‘টোকেন’ বাণিজ্যের অভিযোগ
এদিকে শহরের রাস্তায় চলাচলকারী অনেক মিশুকের গায়ে বিশেষ লেখা বা সাংকেতিক নম্বর দেখা যায়। অটোরিকশাচালকদের একাংশের দাবি, বিভিন্ন গ্যারেজের আওতায় নির্দিষ্ট অংকের ‘মাসিক ফি’ বা টোকেন মানি প্রদান করে এই সংকেতগুলো নেওয়া হয়। নতুন যানবাহনের ক্ষেত্রে মাসে ৫০০ টাকা এবং পুরোনো যানবাহনের জন্য ৩০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া লাগে। যেসব গাড়িতে এই সংকেত থাকে, সেগুলোকে ট্রাফিক অভিযানের মুখে পড়তে হয় না।
তবে টোকেন বা মাসোয়ারা আদায়ের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে জেলা ট্রাফিক বিভাগ। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ট্রাফিক পুলিশ কখনো টোকেন বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ছিল না এবং বর্তমানেও এমন কোনো অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে না।
দেশ মাতৃ