ইস্তিগফার করলে কি রিজিকে বরকত আসে? কতবার ইস্তিগফার করা উচিত?
আমরা অনেকেই জানি, ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। তবে কুরআনে ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান এবং জীবনের নানা কল্যাণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের জীবনে ইস্তিগফার কেবল ক্ষমা চাওয়ার আমল নয়; এটি আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রিজিকে বরকত লাভের আশায় প্রতিদিন কতবার ইস্তিগফার করা উচিত? ১০ বার, ১০০ বার, নাকি আরও বেশি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে পবিত্র কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের কাছে।
ইস্তিগফার ও রিজিক সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা
মহান আল্লাহ নুহ (আ.)-এর বক্তব্য তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
অর্থ: “অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন। আর তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।”
—সুরা নুহ, আয়াত ১০–১২
এই আয়াতগুলোতে নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান এবং অন্যান্য নেয়ামতের সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, আন্তরিক ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে এর অর্থ এই নয় যে, নির্দিষ্টসংখ্যকবার ইস্তিগফার করলেই প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পদ বা আয় অবশ্যই নির্দিষ্ট পরিমাণে বেড়ে যাবে। আল্লাহর দান ও প্রজ্ঞা তাঁর ইচ্ছাধীন।
‘মিদরারা’ শব্দটি আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা ‘মিদরারা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শব্দটি প্রচুর ও ধারাবাহিক বৃষ্টিধারা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
এখানে বৃষ্টির উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ ও প্রাচুর্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একই আয়াতে সম্পদ, সন্তান, বাগান ও নদীর কথাও এসেছে। অর্থাৎ মানুষের জীবনে কল্যাণের বিভিন্ন দিক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে।
তবে এই আয়াতকে এমন নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে, ইস্তিগফার করলেই প্রত্যেকের রিজিক সব সময় একইভাবে বাড়বে। কখনো কল্যাণ সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে আসে, কখনো অভাবের মধ্যেও তৃপ্তি, আবার কখনো বিপদ থেকে মুক্তি বা জীবনে বরকতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
প্রতিদিন কতবার ইস্তিগফার করা উচিত?
ইস্তিগফারের জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ করলেই যথেষ্ট—এমন কোনো সাধারণ সীমা সুরা নুহের উল্লিখিত আয়াতগুলোতে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই ৩০, ৪০ বা ১০০ বার ইস্তিগফার করলেই রিজিক বৃদ্ধির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে—এমন দাবি করা উচিত নয়।
তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিনি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭০২
এই হাদিস থেকে আমরা নিয়মিত ইস্তিগফারের গুরুত্ব বুঝতে পারি। প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফার করা একটি উত্তম অভ্যাস। কেউ এর চেয়ে কম দিয়ে শুরু করলেও সমস্যা নেই; মূল বিষয় হলো আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী এই আমল অব্যাহত রাখা।
প্রতিদিনের জীবনে ইস্তিগফারের অভ্যাস গড়ে তুলুন
ব্যস্ত জীবনে নিয়মিত ইস্তিগফার করার জন্য একটি সহজ রুটিন অনুসরণ করতে পারেন।
- ফজরের পর: ১০–১৫ বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ুন।
- দিনের অবসরে: কাজের ফাঁকে সুযোগ অনুযায়ী ইস্তিগফার করুন।
- রাতে ঘুমানোর আগে: নিজের ভুলত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ইস্তিগফার করুন।
- সুযোগ হলে: রাসুলুল্লাহ ﷺ শেখানো সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পাঠ করুন।
এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস গড়ে তোলার প্রস্তাব; শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যা নয়। চাইলে ধীরে ধীরে প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
ইস্তিগফার শুধু মুখের উচ্চারণ নয়
‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ অর্থ, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কিন্তু ইস্তিগফারের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন মুখের উচ্চারণের সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা ও জীবনে পরিবর্তনের চেষ্টা যুক্ত হয়।
কেউ অন্যের অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। কেউ অন্যায় কাজে জড়িত থাকলে তা ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প করবে। আর কেউ গুনাহ করে ফেললে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে তাওবা করবে।
একই সঙ্গে হালাল উপার্জনের চেষ্টা, দায়িত্ব পালন, পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা বজায় রাখতে হবে। ইস্তিগফারকে পরিশ্রমের বিকল্প নয়, বরং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
শেষ কথা
জীবনে অভাব, দুশ্চিন্তা কিংবা নানা বাধা এলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং নিয়মিত ইস্তিগফারকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিন।
মনে রাখবেন, ইস্তিগফারের উদ্দেশ্য শুধু দুনিয়াবি সম্পদ অর্জন নয়; এর মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর ক্ষমা, সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা। রিজিকে বরকত পাওয়া তার একটি সম্ভাব্য কল্যাণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, হালাল রিজিক দান করুন, উপার্জনে বরকত দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নসিব করুন। আমিন।
দেশ মাতৃ